সর্বশেষ সংবাদ
Home / লাইফস্টাইল / রূপ যেন তার অঙ্গে অঙ্গে

রূপ যেন তার অঙ্গে অঙ্গে

ঝলমলে সোনালি রোদ ছুড়েছে পাহাড়ের চূড়ায়। যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ আরণ্যক। পাহাড়ের গায়ের ওপর দিয়ে সাপের মতো পেঁচানো আকৃতি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে চূড়ায় ওঠার সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার প্রতিযোগিতায় নামেন ভ্রমণপিপাসু মানুষ।

মূল সড়ক থেকে তিন ধাপে সিঁড়ি বেয়ে বেশ কয়েক কদম ওঠার পর চোখে মেলবে সোনালি রঙের ছোট ছোট বাহারি বাংলো। পাহাড়ে সবুজের ভাঁজে ভাঁজে তৈরি করা বাংলোগুলোর অভিজাত্যের ছোঁয়ার সাক্ষী বহন করে।

বাংলোগুলোর গায়ে লেপ্টে থাকা বাহারি রঙ আর কারুকাজ। যেন অনেক যত্ন করে কোনো রাজা তৈরি করেছিলেন এ রাজ্য। পাহাড়জুড়ে ছিল তার রাজত্ব। এ যেন সেই রাজার রাজকন্যা। রূপ যেন তার অঙ্গে অঙ্গে…

সবুজে মোড়ানো পাহাড়, ঝলমলে রোদ আর নির্মল সিগ্ধ বাতাস ভ্রমণপিপাসুদের নিয়ে যায় স্বপ্নের রাজ্যে। এখানে এলে মেলে প্রশান্তি।

 

পাহাড়ঘেরা এই অপরূপ সবুজ আরণ্যক চীনের প্রাচীর (গ্রেটওয়াল অব চায়না)। পৃথিবীর জনবহুল দেশ চীনের বেইজিংয়ে অবস্থিত পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যগুলোর মধ্যে একটি। পৃথিবীর এই আশ্চর্য ও দীর্ঘতম প্রাচীরের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৬৯৫ কিলোমিটার এবং উচ্চতা ৪.৫৭ থেকে ৯.২ মিটার বা প্রায় ১৫ থেকে ৩০ ফুট। চওড়ায় প্রায় ৯.৭৫ মিটার বা ৩২ ফুট।

কথিত আছে- চীনের প্রাচীরের ওপর দিয়ে একসঙ্গে ১২ জোড়া ঘোড়া চলতে পারে।

সরেজমিন গ্রেটওয়াল অব চায়না ঘুরে দেখা যায়, প্রতিদিন বিভিন্ন দেশ থেকে চীনের এই মহাপ্রাচীরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন লাখো দর্শনার্থী। বাবা- মায়ের হাত ধরে আসে ছোট শিশুরাও। প্রতিদিন সকাল থেকে শুরু হয় দর্শনার্থীদের পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার প্রতিযোগিতা। পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার এই প্রতিযোগিতা চলে সূর্য ডোবার আগ পর্যন্ত।

 

বাবা এমান সরকার ও ভাই জনি বাবুর সঙ্গে পাহাড়ের চূড়ায় উঠছিল দুই বছরের শিশু লুইল। এমান সরকার বলেন, অনেক দিন থেকেই ইচ্ছে ছিল পরিবার নিয়ে এখানে বেড়াতে আসব। এসে খুব ভালো লাগছে। আমরা খুব এনজয় করছি। তিনি বলেন, পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যগুলোর মধ্যে চীনের প্রাচীর একটি। তাই মিস করতে চাইনি।

ফ্রান্স থেকে চীনের প্রাচীর দেখতে দম্পতি লার্জ লুইন ও লার্জ মেরি যুগান্তরকে বলেন, আমরা বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করে থাকি। অনেক দিন থেকে চীনের প্রাচীর দেখার ইচ্ছে। আমরা সময়টাকে খুব উপভোগ করছি।

প্রাচীর নির্মাণের কাজ ২২১ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে শুরু হয়ে শেষ হতে সময় লাগে প্রায় ১৫ বছর। দৃষ্টিনন্দন এ প্রাচীর নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে ইট আর পাথর।

কেন তৈরি হয়েছিল চীনের প্রাচীর?

ইতিহাস হতে জানা যায়, সেই সময় মাঞ্চুরিয়া আর মঙ্গোলিয়ার যাযাবর দস্যুরা চীনের বিভিন্ন অংশে আক্রমণ করত এবং বিভিন্ন ক্ষতি সাধন করত। ফলে দস্যুদের হাত থেকে চীনকে রক্ষা করার জন্য এই প্রাচীর তৈরি করা হয়েছিল। ২৪৬ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে চীন বিভিন্ন খণ্ড রাজ্যে বিভক্ত ছিল।

 

তাদের মধ্যে একজন রাজা, যার নাম ছিল- শি হুয়াং-টি, তিনি অন্যান্য রাজার সংঘবদ্ধ করে নিজে সম্রাট হন। চীনের উত্তরে গোবি মরুভূমির পূর্বে দুর্ধর্ষ মঙ্গলিয়াদের বাস, যাদের কাজই হল লুটতরাজ করা। তাদের হাত থেকে দেশকে বাঁচানোর জন্য সম্রাটের আদেশে চীনের প্রাচীর তৈরির কাজ আরম্ভ হয়।

প্রাচীর তৈরি হয়েছিল চিহলি-পুরনো নাম পোহাই উপসাগরের কূলে শানসীকুয়ান থেকে কানসুপ্রদেশের চিয়াকুমান পর্যন্ত। সম্রাটের উদ্দেশ্য কি সিদ্ধ হয়েছিল? এই প্রশ্ন থেকেই যায়। অনেক জায়গা প্রায়ই ভেঙে পড়ত অথবা মঙ্গোল দস্যুরা ভেঙে ফেলে চীনের মূল ভূখণ্ডে লুটপাট করার জন্য ঢুকে পড়ত।

বর্তমানে প্রাচীন ঐতিহ্য বলে রক্ষার ব্যবস্থা করা হলেও প্রাচীরের অনেক জায়গা এখনও কিছু কিছু ভাঙা রয়েছে। এর মূল অংশের নির্মাণ শুরু হয়েছিল প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ২০৮ সালের দিকে।

চীনের প্রথম সম্রাট কিং সি হুয়াং এটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন এবং শত্রুর হাত থেকে নিজের সাম্রাজ্যকে রক্ষার জন্য দীর্ঘ প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন। এটি চীনের প্রাকৃতিক বাঁধাগুলো ছাড়া অন্যান্য অঞ্চল পাহারা দেয়ার কাজে এবং উত্তর চীনের উপজাতি সুইং নু বিরুদ্ধে প্রথম স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল।

 

হান, সুই, নরদান এবং জিং সাম্রাজ্যের সময়ের ইতিহাসেও যে কারণে তারা এটি তৈরি করেছিলেন, ঠিক একই কারণে চীনের প্রাচীরের পরিবর্ধন, পরিবর্তন, সম্প্রসারণ, পুনর্নির্মাণের উল্লেখ আছে।

বেইজিংয়ের উত্তরে এবং পর্যটন কেন্দ্রের কিছু অংশ সংরক্ষণ- এমনকি পুনর্নির্মাণ করা হলেও দেয়ালের বেশ কিছু অংশ ধ্বংসের সম্মুখীন হয়। ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো গ্রাম্য খেলার মাঠ এবং বাড়ি ও রাস্তা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পাথরের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

দেয়ালের কিছু অংশ নাশকতার জন্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেয়াল পুনর্নির্মাণের জন্য কিছু অংশ ধ্বংস করা হয়েছে। উন্নত পর্যটন এলাকার কাছে মেরামতকৃত অংশ পর্যটন পণ্যের বিক্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। দেয়ালটিতে নিয়মিত বিরতিতে পর্যবেক্ষণ চৌকি আছে, যা অস্ত্র সংরক্ষণ, সেনাবাহিনীর আবাসন এবং স্মোক সংকেত প্রদানে কাজে লাগত।

সেনাঘাঁটি ও প্রশাসনিক কেন্দ্রসমূহ দীর্ঘ বিরতিতে অবস্থিত। গ্রেটওয়ালের সীমানার মধ্যে সেনা ইউনিটগুলোর যোগাযোগ যেমন— দলকে শক্তিশালী করা এবং শত্রুদের আন্দোলন সম্পর্কে সাবধান থাকা ছিল উল্লেখযোগ্য। দেখার সুবিধার জন্য পাহাড়সহ অন্যান্য উঁচু স্থানে সংকেত টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

আয়রনের অভাব মেটাতে রান্নায় লোহার মাছ!

বাঙালির খাদ্য তালিকায় একটা বড় জায়গাজুড়ে রয়েছে মাছ। তবে শুধু বাঙালি নয়, ...

Skip to toolbar