সর্বশেষ সংবাদ
Home / অর্থনীতি ও বানিজ্য / দেশে চীনের বিনিয়োগ বাড়াতে পদক্ষেপ জরুরি

দেশে চীনের বিনিয়োগ বাড়াতে পদক্ষেপ জরুরি

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশে শুল্ক আরোপের কারণে নিজ দেশের পণ্য নিয়ে বড় ধরনের সমস্যায় পড়েছে চীন। তাই দেশের বাইরে বিনিয়োগের মাধ্যমে পণ্য উৎপাদন করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রফতানি করতে চাচ্ছে দেশটি।

ভিয়েতনাম, মেক্সিকো ও সার্বিয়াসহ কয়েকটি দেশে এরই মধ্যে বিনিয়োগের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করেছে চীনা কোম্পানিগুলো। আর এ সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ আর্কষণে জরুরিভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।

এক্ষেত্রে অবকাঠামো উন্নয়ন, সুশাসন নিশ্চিত করা, গ্যাস বিদ্যুতের ব্যবহারসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগের কথাও বলছেন তারা। তবে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বলছে, চীনের বিনিয়োগ অব্যাহত রয়েছে। আগামীতেও দেশটির বিনিয়োগ আরও আকর্ষণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যযুদ্ধ চরমে পৌঁছেছে। দুই দফায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের চীনা পণ্য আমদানিতে শুল্কারোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এসব পণ্যে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কারোপ করা হয়েছে।

আরও ২শ’ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে চীনও শুল্কারোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুই কারণে এ শুল্ক আরোপ হচ্ছে। প্রথমত যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত আধিপত্য কেড়ে নিতে চায় চীন। দ্বিতীয়ত বুদ্ধিবৃত্তিক ও ব্যবসায়িক গুরুত্বপূর্ণ নানা প্রযুক্তি চুরিরও অভিযোগ রয়েছে চীনের বিরুদ্ধে। তাই দেশটির বিরুদ্ধে শাস্তিস্বরূপ এ পদক্ষেপ।

আর মার্কিন শুল্ক নিয়ে বেইজিংয়ের ব্যবসায়ীরা আতঙ্কিত। তাই ‘মেড ইন চায়না’ লেবেল এড়াতে ভিয়েতনাম, সার্বিয়া ও মেক্সিকোর মতো দেশের দিকে ঝুঁকছে দেশটির উদীয়মান কোম্পানিগুলো।

এ সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপে গুরুত্ব দিতে বলছেন অর্থনীতিবিদরা।

যদিও বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে চীনের সম্পৃক্ততা বেড়েছে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, ঋণ, অনুদান, বিনিয়োগ এবং বড় প্রকল্পগুলোতে ক্রমেই সম্পৃক্ত হচ্ছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তিশালী এ দেশটি।

২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের পর সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। অবকাঠামো খাতে পদ্মা সেতু প্রকল্প, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎ ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ বড় কয়েকটি প্রকল্পে কাজ করছে দেশটি।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, দেশের অর্থনীতির বড় অংশই কোনো না কোনোভাবে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।

ফলে বড় অর্থনীতির দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে দেশের স্বার্থ রক্ষায় দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে। তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে দেশে বড় সমস্যা- বিনিয়োগের অভাব। যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য দ্বন্দ্বে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর একটি সুযোগ এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের পণ্যের দাম বাড়বে। বাংলাদেশ এর সুফল পেতে পারে। এছাড়াও দেশটি যেহেতু বাইরে বিনিয়োগ করছে, তাই বাংলাদেশ এ সুযোগ নিতে পারে। এক্ষেত্রে বিডাকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিশেষ করে চীনের বেসরকারি কোম্পানিগুলো যাতে বাংলাদেশে আসতে পারে সে সুযোগ সৃষ্টি করা উচিত। তিনি আরও বলেন, তবে উভয় দেশের এ যুদ্ধ দীর্ঘ সময় চললে দুই দেশেরই প্রবৃদ্ধি কমবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে যার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী এম আমিনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো। দেশটির প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশে এসেছিলেন। সর্বোচ্চ পর্যায়ে বৈঠক হয়েছে। অবকাঠামো ও অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ করার কথা দিয়েছেন। চীনের বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিডার পক্ষ থেকে চেষ্টা চলছে। কিছুদিন আগে দেশটিতে বিশ্ব বিনিয়োগ সম্মেলন হয়েছে। সেখানে আমরা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আমাদের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরেছি। এছাড়াও দেশটিতে রোডশো হয়েছে।

বিডার চেয়ারম্যান আরও বলেন, বর্তমানে চীনের প্রতিনিধি দলই বেশি আসছে। প্রতি মাসেই দেশটির দুই-একটি দল বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ সফর করছে। ফলে বিনিয়োগ বাড়বে বলে আশা করছি।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুসারে বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন। ক্রয় ক্ষমতার বিবেচনায় ২০১৭ সালে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার দাঁড়িয়েছে ২৫ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। আলোচ্য সময়ে বাংলাদেশের জিডিপির আকার ছিল ৩৫২ বিলিয়ন ডলার।

অর্থাৎ বাংলাদেশের চেয়ে চীনের জিডিপির আকার ৭০ গুণ বেশি। বিশ্ববাজারের তৈরি পোশাকের ৪০ শতাংশই চীনের দখলে। সাম্প্রতিক সময়ে শ্রমিকদের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাইরে বিনিয়োগ করতে চায় চীন।

এছাড়া অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করছে চীন। চলতি বছরে শুধু পাকিস্তানে ৫৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্র“তি দিয়েছে চীন। এর মধ্যে অবকাঠামো খাতেই ৪৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে দেশটি।

বিডার তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) দিক থেকে চীন নবম অবস্থানে। ২০১৭ সালে দেশটি থেকে বাংলাদেশে এফডিআই এসেছে ৬ কোটি ৮৫ লাখ ডলার। স্থানীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৫৮২ কোটি টাকা। আগের বছরের চেয়ে যা প্রায় ১২ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ বস্ত্র খাতে। এছাড়া চামড়া ও জাতীয় খাতে বিনিয়োগ করছে চীন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, দুই দেশের বাণিজ্য যুদ্ধের কিছু সুফল বাংলাদেশে আসতে শুরু করেছে। মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীরা বলছেন, ইতিমধ্যে চীনের কিছু বিনিয়োগ বাংলাদেশে এসেছে। আরও বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বিশাল। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ৯ মাসে চীন থেকে দেশে ৮৪৫ কোটি ২১ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে।

প্রতি ডলার ৮৫ টাকা হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ৭১ হাজার ৮৪২ কোটি টাকা। একই সময়ে চীনে ৬৯ কোটি ৪৯ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি করেছে বাংলাদেশ। স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ৫ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা।

এ হিসাবে ৯ মাসেই চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ৭৭৫ কোটি ডলার বা ৬৫ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা। আগের বছর অর্থাৎ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ ঘাটতি ছিল ৯২১ কোটি ডলার। বতর্মানে চীনে ৪ হাজার ৭শ’ পণ্য শুল্কমুক্তভাবে রফতানি করতে পারে বাংলাদেশ।

এদিকে চীনের আর্থিক সহযোগিতায় বতর্মানে ১২টি প্রকল্পের কাজ করছে বাংলাদেশ। এসব প্রকল্পে দেশটির মোট সহায়তার পরিমাণ ১ হাজার ১১৫ কোটি ডলার। স্থানীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা।

এর মধ্যে রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যান্ড হাইওয়েতে ১৬০ কোটি ডলার, তথ্যপ্রযুক্তি খাত উন্নয়নে ১৫ কোটি ডলার, কর্ণফুলী ট্যানেলে ৭০ কোটি, রাজশাহী ওয়াসায় ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে ৫০ কোটি ডলার, বিদ্যুৎ খাতের ডিপিসিতে পাওয়ার সিস্টেম নেটওয়ার্কে ৫০ কোটি, পদ্মা সেতু রেল সংযোগের দুই প্রকল্পে ২৫৮ কোটি ডলার, ঢাকা আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসে ১৪০ কোটি ডলার, পাওয়ার গ্রিডে ১৩২ কোটি ডলার ও টেলিকমিউনিকেশন আধুনিকায়নে ২০ কোটি ডলার সহায়তা করছে চীন।

এছাড়া আরও ৯টি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন। এসব প্রকল্পে সহায়তার পরিমাণ ৮০৮ কোটি ডলার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

রফতানি আয়ে ভাটা

চামড়া খাতের রফতানি আয় ক্রমেই কমছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে চামড়া ...

Skip to toolbar