সর্বশেষ সংবাদ
Home / অর্থনীতি ও বানিজ্য / বন্দরে পণ্য ফেলে রাখলে জরিমানা

বন্দরে পণ্য ফেলে রাখলে জরিমানা

আমদানিকারকদের অনেকেই বর্তমানে পণ্য আমদানির পর খালাস না করে দীর্ঘদিন তা বন্দরে ফেলে রাখেন। এতে বন্দরে কনটেইনার জট লাগে। ভোগান্তি পোহাতে হয় অন্যদের, সরকারের রাজস্ব আদায়ও বিলম্বিত হয়। ভবিষ্যতে এ কাজ করলে আমদানিকারককে পণ্য ছাড় করার সময় শুল্ক-করের ওপর নির্ধারিত হারে সুদ (জরিমানা) দিতে হবে। খসড়া কাস্টমস আইন-২০১৮-তে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান যুক্ত করা হয়েছে। বন্দর থেকে পণ্য খালাস দ্রুত করতে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আগামী সংসদ অধিবেশনে আইনটি উত্থাপন করা হবে।

খসড়া আইনে একই ব্যক্তি বারবার একই ধরনের শুল্ক সংক্রান্ত অপরাধ করলে অতিরিক্ত শাস্তি দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এই আইনের সঙ্গে মানি লন্ডারিং, সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধবিষয়ক আইনেরও সংযোগ রাখা হচ্ছে। এক্ষেত্রে ওইসব আইনও কঠোরভাবে পরিপালনের বিধান রাখা হয়েছে।

বন্দরে কনটেইনার জট কমাতে নতুন আইনে সৎ ব্যবসায়ীদের জন্য সহজে পণ্য খালাসের (অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর) ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বর্তমানে পণ্য খালাসের জন্য একাধিক জায়গায় দৌড়াতে হয়। নতুন আইনে এক জায়গা থেকে সব কাজ করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এমনকি আস্থার ভিত্তিতে গ্রিন চ্যানেল দিয়ে পণ্য খালাস করে নিয়ে যেতে পারবেন ভালো ব্যবসায়ীরা। এর ফলে সার্বিকভাবে ব্যবসায় পরিবেশ সহজ হবে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র জানায়, ১৯৬৯ সালের পুরনো কাস্টমস আইনে মোট ২২৩টি ধারা ছিল। নতুন কাস্টমস আইনে থাকছে ২৮৬টি। আইনটিকে আগের চেয়ে অনেক সহজ করা হয়েছে। কাস্টমস আইনটির খসড়া বাংলা ভাষায় তৈরি করা হয়েছে। যেহেতু এই আইনের মাধ্যমে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম পরিচালিত হবে, তাই বিদেশিদের জন্য এটি ইংরেজিতেও প্রণয়ন করা হবে।

এরই মধ্যে মন্ত্রিসভা নতুন কাস্টমস আইনের খসড়া অনুমোদন দিয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংও শেষ হয়েছে। এনবিআর মনে করে, আইনটি বাস্তবায়িত হলে রাজস্ব আদায় বাড়বে। আমদানি-রফতানি পণ্য দ্রুত ও অল্প খরচে খালাস করা যাবে। মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি হ্রাস পাবে। জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জাতীয় নিরাপত্তা বাড়ানোর সহায়ক হবে। সব মিলে দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে।

সূত্র জানায়, নতুন কাস্টমস আইনে ব্যবসায়ীদের সুপারিশকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। যে কোনো বিধি প্রণয়নের আগে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা-পরামর্শ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অর্থাৎ আলোচনা ছাড়া নতুন কোনো বিধিবিধান প্রণয়ন করা যাবে না। আগের আইনে এনবিআর চাইলে আলোচনা ছাড়াই প্রজ্ঞাপন, বিধি পরিবর্তন করতে পারত। এ নিয়ে একাধিক সভা-সেমিনারে ব্যবসায়ী নেতারা এনবিআরের সমালোচনা করেছেন।

এ বিষয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে এনবিআরসহ ব্যবসা-বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট সব সংস্থারই আইনি বিধিবিধান প্রণয়ন করা উচিত। এতে ভুল-ত্রুটির শঙ্কা কম থাকে। পাশাপাশি নীতির স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। তিনি আরও বলেন, বন্দরে জট কমাতে জরিমানার বিধান যুক্ত করার উদ্যোগটি ভালো। অনেকে বন্দরকে ওয়্যারহাউস হিসেবে ব্যবহার করে। তবে দেখতে হবে, কাস্টমসের অসহযোগিতার কারণে অন্যায়ভাবে যাতে কেউ এ জরিমানার শিকার না হন।

পলিসি রিসার্স ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, শুধু ব্যবসায়ী নয়, যে কোনো আইন ও বিধি প্রণয়নের আগে সব অংশীজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা উচিত। কাস্টমস আইনের পরিবর্তন-পরিবর্ধনের ক্ষেত্রে ব্যাংক, শিপিং এজেন্ট, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স, বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের যৌক্তিক দাবি অন্তর্ভুক্ত করা হলে ব্যবসায় অনেক জটিলতা দূর করা সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান কাস্টমস আইনটি অনেক পুরনো। এটি ব্যবসা-বাণিজ্যের নিত্যনতুন জটিলতা দূর করতে পারছে না। নতুন আইন ট্রেড ফ্যাসিলিটেশনে ভূমিকা রাখবে। এ আইনটি বাস্তবায়ন হলে বিনিয়োগকারী ও ভোক্তা উভয়েই উপকৃত হবে। এনবিআর সূত্র জানায়, নতুন আইন বাস্তবায়ন হলে আমদানি-রফতানিকারকরা অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পাবেন। যেমন- পণ্য আমদানির আগেই শুল্ক-কর কী হবে তা এনবিআর থেকে আগাম (এডভান্স রুলিং) জানতে পারবেন। কাস্টমস সম্পর্কিত জিজ্ঞাসা থাকলে কাস্টমসের ওয়েবসাইটে প্রশ্ন করে উত্তর পাওয়া যাবে। ইনকোয়ারি পয়েন্টে প্রশ্ন করে পণ্যের এইচএস কোড, শুল্ক-কর হারসহ যাবতীয় তথ্য জানতে পারবেন।

অন্যদিকে পণ্যের আগাম শুল্কায়নও করা যাবে। এ জন্য অ্যাডভান্স কার্গো ডিক্লারেশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি কাস্টমসের সব আইনবিধি, প্রজ্ঞাপন, আদেশ এনবিআরে ওয়েবসাইটে প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে আমদানি-রফতানি কাজে সংশ্লিষ্টরা সুবিধা পাবেন।

নতুন আইন অনুযায়ী সৎ ব্যবসায়ীদের অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর (এইও) সনদ দেয়া হবে। এ সনদধারীরা দশ ধরনের সুবিধা পাবেন। এরা বন্দর থেকে সরাসরি পণ্য খালাস করে নিতে পারবেন। কাস্টমস হাউস বা শুল্ক স্টেশনের পরিবর্তে এই সনদধারীদের পণ্য নিজস্ব কারখানা প্রাঙ্গণে কায়িক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। এই প্রক্রিয়া যাতে দ্রুত শেষ হয়, সে জন্য শুল্ক বিভাগের বিশেষ দল কাজ করবে। বন্দরে পণ্য আসার আগেই বিল অব এন্ট্রি দাখিলসহ শুল্কায়নের কাজ শেষ করা যাবে। অবশ্য এ সুবিধা পেতে হলে ব্যবসায়ীদের কিছু শর্ত মানতে হবে।

নতুন কাস্টমস আইনে আমদানি পণ্যের শুল্কায়নের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। পণ্য খালাসে শুধু আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও বিশ্ব বাণিজ্য উপযোগী ট্রানজেকশন মূল্যের ভিত্তিতে শুল্কায়ন করা হবে। বর্তমান আইনে পণ্য শুল্কায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। শুল্কায়নযোগ্য পণ্যের মুদ্রা বিনিময় হার কীভাবে নির্ধারিত হবে তাও নতুন আইনে বলা হয়েছে। এলসি খোলার তারিখে ডলারের মূল্য অনুযায়ীই পণ্যের শুল্কায়ন

করা হবে। এরপর ডলারের দাম কমলে বা বাড়লেও তাতে প্রভাব পড়বে না। বর্তমানে শুল্কায়নের ক্ষেত্রে আগের মাসের ডলারের গড় হারকে বিবেচনা করা হয়। মিথ্যা ঘোষণা ও চোরাচালান রোধে নতুন আইনের অধীনে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ইউনিট গঠন করা হবে।

পাশাপাশি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিও নির্ধারণ করা হবে। নতুন আইনে আমদানিকারক ও রফতানিকারকদের দায়িত্ব সুস্পষ্ট করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

রফতানি আয়ে ভাটা

চামড়া খাতের রফতানি আয় ক্রমেই কমছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে চামড়া ...

Skip to toolbar