সর্বশেষ সংবাদ
Home / আন্তর্জাতিক / দুই-এক মাসে মীমাংসা অসম্ভব

দুই-এক মাসে মীমাংসা অসম্ভব

মহা সংঘের শ্রদ্ধেয় সদস্যরা, সব ধর্মের পণ্ডিত-পুরোহিত, শ্রীলংকার জনগণ এবং আমার বন্ধুরা- শ্রীলংকার চলমান রাজনৈতিক সংকট এক-দুই মাসে সমাধান অসম্ভব। ১৫ নভেম্বর পার্লামেন্টের বক্তব্যে সব দলের কাছে আমি একটা প্রস্তাব দিয়েছিলাম। প্রস্তাবটি ছিল সবাই মিলে একটা আগাম নির্বাচনের আয়োজন করা। জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে যাতে নিজেদের পছন্দমতো একটা সরকার নির্বাচিত করতে পারে। জনতা বিমুক্তি পেরুমেনা (জেভিপি) প্রস্তাবে সম্মতি জানালেও বেঁকে বসে ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (ইউএনপি)।

ইউএনপির নেতা বললেন, আগাম জাতীয় নির্বাচনের বদলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দিতে হবে। কিন্তু সমস্যা যেহেতু পার্লামেন্টের তাই এই মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রয়োজন নেই। ২০১৫ সালের নির্বাচনে পার্লামেন্টে কোনো দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনার ইউপিএফএ’র সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার গঠন করে ইউএনপি। কিন্তু ২৬ অক্টোবর জোট থেকে বের হয়ে এসেছে ইউপিএফএ। কিছু ইউএনপি এমপিও দলত্যাগ করে আমাদের দলে যোগ দিয়েছেন। এখন আমিই পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা। ১৯৯৪, ২০০১ ও ২০০৪-এর জাতীয় নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্ট ডিবি বিজেতুঙ্গা এবং প্রেসিডেন্ট চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা উভয়ই সেই সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকেই সরকার গঠনের আহ্বান জানান।

২৬ অক্টোবর (প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে রনিল বিক্রমাসিংহেকে বরখাস্ত ও রাজাপাকসেকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেন প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা) যা কিছু ঘটেছে তার উদ্দেশ্য ছিল একটা অন্তর্বর্তী সরকার গঠন। এই সরকার স্থায়ী হবে একটা আগাম নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত যে নির্বাচনের তারিখ ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছেন। কিন্তু সুপ্রিমকোর্টের আদেশে অস্থায়ীভাবে স্থগিত হয়ে আছে। আমরা যে সরকার গঠন করেছি, সেই সরকার দিয়েই প্রশাসন চালানোর কোনো ইচ্ছেই আমাদের নেই। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার পর থেকেই আমি জোর দিয়ে বলে আসছি, আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে দেশে একটা স্থিতিশীল সরকার গঠনের উদ্দেশ্যে একটা সুষ্ঠু আগাম নির্বাচন করা। কিন্তু বিরোধী দলের উদ্দেশ্য হচ্ছে, কোনো নির্বাচন ছাড়াই আগের সরকারই ফিরিয়ে আনা। এটাই দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের একমাত্র কারণ।

কেউ কেউ প্রশ্ন করছেন, পরবর্তী নির্বাচনের ১৮ মাস আগেই কেন আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ করলাম। ইউএনপি’র এমপিরাও বলছেন, ধৈর্য ধরে আর মাত্র ১৮ মাস অপেক্ষা করলেই পার্লামেন্টে দুই-তৃতীয়াংশ আসনের বিরাট জয় পেতাম আমি। আমার জবাব হচ্ছে, অব্যাহতভাবে দেশ চালাতে আমরা সরকার গঠন করিনি। একটা আগাম নির্বাচন আয়োজনই এ সরকার গঠন করা হয়েছে। এটা ক্ষমতার কোনো প্রশ্ন নয়। আমাদের দেশ এবং দেশের তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ এখন সংকটে। সাবেক অর্থমন্ত্রী দাবি করেছেন, সরকারে পরিবর্তনের কারণে আমাদের অর্থনীতির ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু আগের সরকারের সময়ে অর্থনীতির দুরবস্থার কারণেই প্রেসিডেন্ট আমাকে প্রধানমন্ত্রী করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশই যেটা করবে সেটা হচ্ছে, আগাম নির্বাচন এবং নির্বাচিত দলের একটা স্থিতিশীল সরকার গঠন।’ প্রেসিডেন্ট অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন করছেন এবং তিনি জানেন কঠিন পরিস্থিতি কিভাবে সামাল দিতে হয়। আমরা এক সময় যুদ্ধের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করেছি। বড় বড় অর্থনৈতিক প্রকল্প গ্রহণ করেছি। ২০০৭ সালে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট দেখা দিলেও আমরা আমাদের জনগণকে সেটা বুঝতে দিইনি। ২০০৮ সালে বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও শ্রীলংকার জনগণ সেটা টের পায়নি। এমনকি সেই সময় জ্বালানি তেলের মূল্য সর্বকালের রেকর্ড ছাড়ালেও আমরা সেই সংকট ভালোভাবেই মোকাবেলা করেছি। মাত্র ৯ বছরের মধ্যে মাথাপিছু আয় তিনগুণ বাড়াতে সক্ষম হয় আমাদের সরকার। আমাদের সময়েই ধারাবাহিকভাবে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। প্রতি ডলারে মুদ্রার বিনিময় মূল্য ছিল ১৩১ রুপি। ডিডিপির বিপরীতে ঋণের পরিমাণ ছিল ৭০ শতাংশ। ২০১৫ সালে অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল একটা দেশ আমরা নির্বাচনে সরকারের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। কিন্তু চার বছরের মাথায় সেই অর্থনীতি এখন বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছেছে। অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ দৃষ্টান্ত হচ্ছে বৈদেশিক ঋণের বোঝা।

২০০৬ সালে তামিলবিরোধী লড়াই শুরু হয়। লড়াই চালিয়ে নিতে কৃষক, শ্রমিক থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, ব্যবসায়ী সংগঠন, ভোক্তা, সরকারি চাকুরিজীবীসহ দেশের সর্বস্তরের জনগণ আমাকে সমর্থন করেছেন। জনগণের পূর্ণ সমর্থনেই সফলভাবে শেষ হয় লড়াই। এবং লড়াইয়ের মধ্যেও দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে আমরা সক্ষম হয়েছিলাম। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জনগণ আমাদেরকে যেভাবে সমর্থন দিয়েছিল, এখনকার অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় আমাদেরকে ফের সমর্থন দিতে সবার কাছে অনুরোধ রাখছি। সংকট সমাধানে এটাই আমাদের সর্বশেষ সুযোগ। আমাদের এই চেষ্টা যদি ব্যর্থ হয়, শ্রীলংকা গ্রিসের মতো অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া দেশে পরিণত হবে।

২০১৫ সালের আগে ও পরে দেশে কি কি পরিবর্তন ঘটেছে জনগণ খুব করেই জানে। ইউএনপি দলে মুখপাত্র সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন, শুধু খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্য ২০১৫ সালে জনগণ সরকার পরিবর্তন করেনি। দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতেই ভোট দিয়েছে। কিন্তু দেশে এখন প্রকৃতপক্ষে কোনো গণতন্ত্র নেই। জনগণের ভোটের অধিকার নেই। তারা না খেয়ে না পরে দিন যাপন করছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ চায় শ্রীলংকার জনগণ। বর্তমানে সেই চেষ্টাটাই আমরা করে যাচ্ছি। দিন বদলের শেষ সুযোগ এখনই। ত্রিরত্ন আপনাদের দেখে রাখুক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

হাতির সমান গরু!

মাঠে চরে বেড়াচ্ছে শত শত গরু। পালের সঙ্গে হেলেদুলে ঘুরে ঘুরে ঘাস ...

Skip to toolbar