বর্ষবরণে যৌন হয়রানি : তিন বছরে একজনেরও সাক্ষ্য হয়নি

এবছর ভিন্ন কারণে বৈশাখী উৎসবে চারুকলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, রমনার বটমূল, শাহবাগ সরব না হলেও দিনটি উৎসবের। বাঙালীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত এই উৎসব।

উৎসবকে ঘিরে ঢল নামে মানুষের। আনন্দের মধ্যদিয়ে প্রতিবছরই নববর্ষকে বরণ করে সব শ্রেণি পেশার মানুষ। বর্ষবরণের সুন্দর এই উৎসবেও কলঙ্কের দাগ লাগে ২০১৫ সালে। পহেলা বৈশাখে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে টিএসসিতে ঘটে ঘৃণ্য যৌন হয়রানি। ঘটনার পর নিন্দা ও প্রতিবাদে কেঁপে ওঠে পুরো দেশ।

দুঃখজনক ব্যাপার, দেখতে দেখতে পাঁচ বছর কেটে গেলেও শেষ হয়নি সেই যৌন হয়রানির মামলার বিচার। ৮ জন আসামির মধ্যে সাতজনকেই গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি আজো। মো. কামাল নামের এক আসামিকে নিয়েই মামলার বিচারকাজ চলছে, তাও অত্যন্ত ধীর গতিতে। মামলাটিতে শুধু তারিখ আসে আর তারিখ যায়, এভাবেই চলছে। সাক্ষী না আসায় থমকে আছে বিচার। মামলাটির বিচার কবে শেষ হবে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা।

মামলাটি ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮ এর বিচারক বেগম মাহফুজা পারভীনের আদালতে বিচারাধীন। ঘটনার দুই বছর পর ২০১৭ সালের ১৯ জুন মামলাটিতে একমাত্র আসামি কামালের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয়। বিস্ময়কর যে, গত তিন বছরে মামলায় একজনেরও সাক্ষ্য গ্রহণ হয়নি।

সর্বশেষ গত ১২ মার্চ মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ধার্য ছিল। কিন্তু এদিন পুলিশ আদালতে সাক্ষী হাজির করতে না পারায় আদালত আগামী ১২ জুলাই সাক্ষ্যগ্রহণের পরবর্তী দিন ধার্য করেন।

মামলাটি সম্পর্কে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু বলেন, ‘মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে আছে। সাক্ষী না আসায় সাক্ষ্য গ্রহণ হচ্ছে না। সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে সমন পাঠানো হয়। পুলিশের দায়িত্ব সাক্ষীদের আদালতে হাজির করা। কিন্তু পুলিশ তা করছে না। আর মামলাটি করেছেও পুলিশ। মামলা করে তারা সাক্ষী দিতে আসছে না কেন আমার বোধগম্য নয়। করোনাভাইরাসের কারণে আদালত ছুটিতে আছে। ছুটি শেষ হলে সাক্ষীরা যেন আদালতে এসে হাজির হয়ে সাক্ষ্য দেন সে ব্যবস্থা করবো।’

সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ‘আমরা সাক্ষীদের আনার চেষ্টা করছি। মামলাটি প্রথমে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩, এরপর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫ এ বিচারাধীন ছিল। পরবর্তীতে মামলাটি এ আদালতে বিচারের জন্য বদলী করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মামলাটি পরিচালনা করা হচ্ছে। আর এ মামলার বাদী পুলিশ। সাক্ষীদের আদালতে আনার দায়িত্বও পুলিশের। কিন্তু পুলিশ সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে পারছে না। এতদিন পুলিশের অপেক্ষায় ছিলাম যে তারা সাক্ষীদের আদালতে হাজির করবেন। কিন্তু পুলিশ তা পারছে না। এরপর ব্যক্তি উদ্যোগে সাক্ষীদের আদালতে হাজির করার চেষ্টা করবো। সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে যা যা করার সব করবো। সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো সাক্ষী হাজির করে মামলাটির বিচার শেষ করার।’

আসামিপক্ষের আইনজীবী আনিসুর রহমান বলেন, ‘মামলার এজাহারে কামালের নাম ছিল না। পুনঃতদন্তে চার্জশিটে তার নাম এসেছে। সে একজন ডায়াবেটিস রোগী। লালবাগের খাজী দেওয়ানে সে সবজির ব্যবসা করে। যেহেতু সে ডায়াবেটিস রোগী, এজন্য ওইদিন সে বের হয়েছিল হাঁটাহাটি করার জন্য। ওই ঘটনা ঘটার পরে জায়গাটা ফাঁকা হয়ে যায়। এরপর কামাল সেখানে হাঁটাহাটি করতে যায়। সেখানে যে কোনো ঘটনা ঘটছে, সে বিষয়ে কামাল কোন কিছু জানতো না। সে হেঁটে এসেছিলো আর তার ছবি ওই ভিডিও ফুটেজে এসেছে। এরপর তদন্ত কর্মকর্তা তাকে গ্রেপ্তার করেছে। ভিডিও ফুটেজে এমন কিছু আসেনি যে, সে কাউকে ধরছে, টানছে বা শ্লীলতাহানি করছে। ভিডিও ফুটেজে তার ছবি আসার কারণে তাকে মামলায় জড়ানো হয়েছে। সে অপরাধ সম্পর্কে কিছুই জানে না।’

তিনি বলেন, ‘ওই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রকৃত আসামিদের পুলিশ গ্রেপ্তার করতে ব্যর্থ হয়েছে। যেনতেনভাবে চার্জশিট দিয়ে নিরাপরাধ ব্যক্তিকে মামলায় সম্পৃক্ত করেছে। মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আছে। অথচ প্রায় তিন বছরে কোনো সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে আসছেন না। আসামির নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। তিনি ভোগান্তির শিকার। ন্যায় বিচার সকলের প্রত্যাশা। প্রকৃত আসামিদের গ্রেপ্তার না করে অযথা ভুলভাবে তাকে মামলায় গ্রেপ্তার করেছে। আমরা ন্যায় বিচার আশা করছি। আর ন্যায় বিচারে আসামি খালাস পাবেন।’

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় কয়েকজন নারীকে যৌন হয়রানি করা হয়। ওই ঘটনায় ভিকটিমদের পক্ষ থেকে কেউ মামলা না করায় শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ বাদী হয়ে যৌন হয়রানির অভিযোগে অজ্ঞাতদের আসামি করে মামলা দায়ের করেন। শাহবাগ থানার পুলিশ মামলাটি কয়েকদিন তদন্তের পরই তদন্তভার ডিবি পুলিশকে দেওয়া হয়।

মামলার একমাস পর ১৭ মে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ভিডিও থেকে আটজন যৌন হয়রানিকারীকে শনাক্ত ও তাদের ছবি পাওয়ার কথা জানান তৎকালীন পুলিশ প্রধান একেএম শহীদুল হক। শনাক্তকৃতদের ধরিয়ে দিতে এক লাখ টাকা করে পুরস্কার ঘোষণা করে পুলিশ। কিন্তু তাদের নাম-ঠিকানা না পাওয়ার অজুহাতে ২০১৫ সালের ৯ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের এসআই দীপক কুমার দাস আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। ওই চূড়ান্ত প্রতিবেদনও গ্রহণ করেন ট্রাইব্যুনাল। পরে শনাক্তকৃত আসামিদের মধ্যে মো. কামাল (৩৫) গ্রেপ্তার হলে তাকে প্রথমে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে মামলাটি পুনঃতদন্তের আবেদন করা হয়।

২০১৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার তিন নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল মামলাটি পুনঃতদন্তের আদেশ দেন। পুনঃতদন্ত শেষে ২০১৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর পিবিআইয়ের পরিদর্শক আব্দুর রাজ্জাক একমাত্র আসামি কামালকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। ২০১৭ সালের ১৯ জুন ঢাকার তিন নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক জয়শ্রী সমাদ্দার ওই আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন।

মামলাটিতে কামাল জামিনে আছেন। হাইকোর্ট থেকে তিনি জামিন পেয়েছেন।

এদিকে মামলাটির চার্জশিটে ৩৪ জনকে সাক্ষী করে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, মামলাটি তদন্তকালে একাধিকবার ঘটনাস্থল গিয়ে প্রত্যক্ষ সাক্ষী, ভিকটিমদের সন্ধান এবং আসামিদের সন্ধান ও গ্রেপ্তারের সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়। কামাল ব্যতিত অন্য কোন আসামির সন্ধান পাওয়া যায়নি। ৮ আসামির জন্য এক লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা এবং বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচার করা সত্ত্বেও আসামিদের নাম-ঠিকানা ও সন্ধান পাওয়া যায়নি। বাকি সাতজনের সন্ধান পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

সম্পাদকঃ শারমিন আক্তার, প্রকাশকঃ মোঃ এনামুল হক, হুজাইফা এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড কর্তৃক চৌধুরী মল ৪৩, শহীদ নজরুল ইসলাম সড়ক (হাটখোলা রোড), টিকাটুলি, ঢাকা-১২০৩ হতে প্রকাশিত। ফোন-ফ্যাক্স: ৭১২৫৩৮৬। । ই-মেইল: tatkhonik@gmail.com