যেভাবে কাটছে কাপ্তাইয়ের শিল্পীদের জীবন

পাহাড়ি জেলা রাঙ্গামাটির অন্যতম একটি উপজেলা ‘কাপ্তাই’। জেলার পরিচয়ের বাইরে ‘কাপ্তাই’কে স্বনামে চেনে সবাই। তেমনি কাপ্তাই’র সাংস্কৃতিক ভুবনও সমৃদ্ধ।

কাপ্তাইকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে সৃষ্টি হয়েছে অনেক শিল্পী। যারা নিজস্ব পারফরম্যান্সে মাতিয়ে রাখেন কাপ্তাই’র সংস্কৃতি অঙ্গন। নিজস্ব গণ্ডি ছাড়িয়েও অনেক শিল্পীকে জেলার বাইরেও পারফর্ম করতে দেখা যেতো। দেশের করোনা পরিস্থিতিতে আজ তারা ভাল নেই। লকডাউনে আটকা পড়ে অন্য সবার মতো তারাও এখন গৃহবন্দী।

করোনার প্রকোপে বাতিল হয়ে গেছে তাদের সব অনুষ্ঠান। গৃহকোণে বেকার, কর্মহীন জীবন কাটছে এসব শিল্পীদের। এই করোনা পরিস্থিতিতে কীভাবে তাদের পার হচ্ছে সময়- কথা হয় কাপ্তাইয়ের তেমন কয়েকজন গুণী শিল্পীর সাথে। যাদের মধ্যে রয়েছেন সঙ্গীত শিল্পী, যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পী ও আবৃত্তি শিল্পী।

কাপ্তাই শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক সঙ্গীত শিক্ষক ফনিন্দ্র লাল ত্রিপুরা বলেন, ‘আমরা শিল্পকলার উদ্যোগে প্রতি মাসে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান করতাম। সকলের সাথে দেখা হতো। আড্ডা হতো। কিন্ত আজ বিগত একমাস ধরে কারো সাথে দেখা সাক্ষাত নেই, নেই কোন সঙ্গীতানুষ্ঠান। এটা খুব কষ্টের।’

একই কষ্টের কথা জানালেন কাপ্তাই শিল্পকলা একাডেমির যুগ্ম সম্পাদক মংসুইপ্রু মারমাও। কারণ, এভাবে দিন যে তাদের কাটছে না।

বেতার শিল্পী ও সঙ্গীত শিক্ষক বিপুল বড়ুয়া বললেন, ‘এ পরিস্থিতিতে বিদ্যালয়ের ছাত্র/ ছাত্রী, শিক্ষক, অভিভাবক, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু -বান্ধব, আমাদের শিল্পীদের খুবই মিস করছি। এমন পরিস্থিতির মধ্যে কিছুক্ষণ সঙ্গীত চর্চা, টিভি দেখা, কম্পিউটারে কাজ করা, মোবাইলে কথা বলে সবার খোঁজ খবর নিয়ে সময় কাটাচ্ছি। এছাড়া আমাদের সকাল-বিকাল দুইবেলা সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করি, যাতে আমরা সবাই এ মহামারি করোনাভাইরাস থেকে মুক্তিলাভ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারি।’

সাংস্কৃতিক সংগঠক, সাংবাদিক এবং যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পী ঝুলন দত্ত বলেন, ‘খুব খারাপ সময় পার করছি। প্রতিদিন কোন না কোন প্রোগ্রামে অংশ নিতাম, এখন সেই সময়টা পার হচ্ছেনা কোনরকম। তবে যেহেতু আমি মিডিয়ার সাথে জড়িত, তাই স্পটে গিয়ে অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে নিউজ করছি।’

কাপ্তাইয়ের মেলোডি গানের শিল্ল্পী মো. রফিক জানান, ‘কতদিন মঞ্চে গান করছি না, এটা একজন শিল্পী হিসাবে বড় কষ্টের।’

বাউল শিল্পী রফিক আশেকী বলেন, ‘গান করে আমরা মানুষকে আনন্দ দিতাম, পাশাপাশি অর্থ উপার্জন করে সংসার চালাতাম। বর্তমান করোনা সংকটে আমাদের জীবন পরিবর্তন করে দিয়েছে।’

আবৃত্তি শিল্পী উপস্থাপক নুর মোহাম্মদ বাবু, খোদেজা আক্তার ভাষা, শুদ্ধশ্রী বর্ন এদের সবারই দীর্ঘশ্বাস- ‘কতদিন প্রিয় মাইক্রোফোন হাতে ধরি না, এটা একজন শিল্পী হিসাবে বড় বেদনার।’

সঙ্গীত শিল্পী রওশন শরীফ তানি, বসুদেব মল্লিক, মংসাই মারমা, সূর্য্যসেন তঞ্চঙ্গ্যা তাদের সেই একই আক্ষেপ- সঙ্গীত ছাড়া জীবন কতো কষ্টের কতো বেদনার, তা প্রকাশ করা কঠিন। কতোদিন প্রিয় শিল্পীদের সাথে দেখা হচ্ছে না!

কাপ্তাইয়ের সুপরিচিত নৃত্য প্রশিক্ষক সংগীতা দত্ত এনি বলেন, ‘কতোদিন প্রিয় মুখগুলো দেখি না, প্রতি মুহূর্তে তাদের মিস করছি।’

যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পী অভিজিত দাশ, মিনহাজ, রোকন, অর্ণব মল্লিক এরা জানালেন, এই সময়টায় তারা খুব বেশি মিস করছেন প্রতিদিন একই মঞ্চে কাজ করে আসা শিল্পী বন্ধুদের। তারা করোনাভাইরাস সংক্রমন প্রতিরোধে বাসায় থেকে সঙ্গীত চর্চা, লেখাপড়াসহ আনুষাঙ্গিক কাজে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করছেন। পূর্বে কাজের চাপে পরিবারকে সময় দিতে পারেননি, এখন পরিবারের সাথে সময়টা পার করছেন। তাদের আশা, খুব দ্রুত এই দুর্দিন কেটে আবার সুদিন ফিরে আসবে।

সঙ্গীতশিল্পী জ্যাকলিন তঞ্চঙ্গ্যা, শিমলা, রোজি, লিপি- এরা বাসায় বসে সময় কাটানোকে খুবই কষ্টের বলে জানান। নিজেকে, পরিবারকে এবং দেশের মানুষকে রক্ষার্থে যে যার বাসায় অবস্থান করছেন। আর বাসায় বসে রান্নাবান্না, ঘর গুছানো, টিভি দেখা, গান করা, পরিবারের সদস্যদের সাথে গল্প করা, এক সাথে খাওয়া দাওয়া- এসব করে সময় পার করছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

সম্পাদকঃ শারমিন আক্তার, প্রকাশকঃ মোঃ এনামুল হক, হুজাইফা এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড কর্তৃক চৌধুরী মল ৪৩, শহীদ নজরুল ইসলাম সড়ক (হাটখোলা রোড), টিকাটুলি, ঢাকা-১২০৩ হতে প্রকাশিত। ফোন-ফ্যাক্স: ৭১২৫৩৮৬। । ই-মেইল: tatkhonik@gmail.com